নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শুধু পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিক্রমার ওপর নির্ভর করে না—কথাটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য, বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা অনেকটাই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত, কারণ পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত সংযুক্তি আছে। শুধু তাই নয়, সীমান্তকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক লেনদেনের বড় একটি অংশ বিদ্যমান আছে। পূর্বে সীমান্তসংক্রান্ত নানা বিরোধ থাকলেও পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো ভারতীয় জনতা পার্টির বিজয় সীমান্ত নিরাপত্তায় অন্যতম শঙ্কা যোগ করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল যদি তিন ভাগে ভাগ করা হয়, যেমন ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭ কংগ্রেস, ১৯৭৭ থেকে ২০১১ বামফ্রন্ট এবং ২০১১ থেকে ২০১৬ অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস, তাহলে দেখা যায়—এই তিন আমলে ধর্মীয় মেরূকরণ, নাগরিকত্ব, পরিচয় প্রভৃতি বিষয় তেমন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু ছিল না। যদিও কংগ্রেসের ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭ সালের মাঝে দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ এবং অন্যান্য ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে দাঙ্গা এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বিরাজমান ছিল। তবে সেই আমলে সীমান্ত প্রশ্ন মূলত মানবিক ও উদ্বাস্তু সংকট হিসেবে দেখা হয়েছিল, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট হিসেবে নয়। প্রায় ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্টের আমলে সীমান্তবর্তী এলাকায় ভোটের তালিকায় অনিয়ম এবং অনুপ্রবেশ বিষয়ে বিরোধীরা ধারাবাহিকভাবে সীমান্তকেন্দ্রিক ‘ভোট-ব্যাংক রাজনীতির’ অভিযোগ তুলেছে, যদিও বামপন্থিরা বিষয়টাকে অতিরঞ্জিত জাতীয়তাবাদী প্রচারণা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
বিরোধীদের এইসব বিতর্কের সুনির্দিষ্ট তেমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি; অতএব, এগুলো রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবেই বহাল থেকেছে। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। ২০১৪ সালের পর কেন্দ্রীয়ভাবে বিজেপির উত্থান জাতীয় রাজনীতিতে নাগরিকত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা ও পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক মেরূকরণকে আরো জোরদার করে, যার সরাসরি প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও পড়ে। নাগরিকত্ব ও এনআরসি নীতির বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে একধরনের প্রতিরোধ তৈরি করে। এনআরসি ও সিএএ ইস্যুকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তৃণমূল বরাবরই বজায় রেখেছে, বা বলা যেতে পারে, পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও নাগরিক মর্যাদা রক্ষায় তৃণমূল তৎপর ছিল। অন্যান্য অনেক রাজ্যে সংখ্যালঘু ও নাগরিক পরিচয়সংক্রান্ত দাঙ্গা হলেও এই ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। তাই মুসলিম ভোটের একটি বড় অংশ বরাবরই তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোটের মাঠে সুবিধা দিয়েছে।